ওয়ালিউর রহমান বাবু: স্বাধীনতার আন্দোলন চলছে। রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীর মধ্য শহরে প্রবেশে বাধা দিতে টেলিফোন যোগাযোগের কাজের কৌশলে বর্ণালী সিনেমা হলের কাছে রাস্তা কেটে টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। ২৫ মার্চ রামচন্দ্রপুর এলাকার মীর রহমত আলী (শহিদ) তার বাড়িকে নিরাপদ স্থান হিসেবে প্রস্তুত করেন। ডিআইজি মামুন মাহমুদ বাঙালি পুলিশদের সর্তক থাকতে পরামর্শ দেন। এমএলএ নাজমুল হক সরকার, নারী নেত্রী জিনাতুল নেসা তালুকদার, আসমা আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশ আওয়ামী লীগ অফিসে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পুলিশ লাইনে হাবিলদার অতিয়ার (শহিদ) এর সামনে একজন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কুটক্তি করলে তিনি এর জোড়ালো প্রতিবাদ করেন। দুপুরে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকাপ্টার ক্যান্টনমেন্টে আসে। বিকেলে ভুবন মোহন পার্কে ক্রিড়াবিদদের সভায় জাফর ইমাম সহ অন্যরা বক্তব্য দেন। ক্রিড়াবিদ হান্নান বলেন “এবার গুলি চালালে হাফ ভলি মেরে তোমাদের রাইফেল ফেলে দেয়া হবে। সন্ধ্যায় ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর পরিচালনায় গন সংগীত পরিবেশনের পর চলচিত্র পরিচালক আতাউর রহমানের লেখা ‘রক্তের রং লাল, নাটক মনস্থ হয়। সেনাবাহিনী আসে পাশের অবস্থানে থাকে। বাঙালি পুলিশ অফিসারদের বাড়ির বিদ্যুত ও টেলিফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন পুলিশ লাইনের ম্যাগাজিন রুমে ডুকতে চাইলে বাধা পান। রাজশাহী জেলা সদরের কাজিহাটা পাড়ার সুবেদার মেজর শওকত আলী ঢাকা পিলখানা ইপিআর হেড কোয়াটার থেকে ছাত্র নেতা কাজী আরিফের মাধ্যমে তার কাছে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা তার তৈরি ব্লাক সেটের প্রচার করে সহকর্মী সহ ধরা পড়ে নির্যাতিত হন। মধ্য রাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্ড আব্দুুুুুুুুর রাজ্জাকের কাছ থেকে প্রশাসন ভবনের চাবি কেড়ে নিয়ে তাকে হত্যা করে। তারা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল হাদিকে না পেয়ে তার ভাই আব্দুল হক কে হত্যা করে মৃত দেহ নিয়ে যায়। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট জন সিপাইপাড়ার আ্যডভোকেট আব্দুস সালামের দুই সন্তান সেলিম, ওয়াসিম কে ধরে নিয়ে যাবার সময় তাদের আপনজন আব্দুস সাত্তারকে লাঞ্চিত করে। ঝাউতলা মোড়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মনিরুজ্জামানকে না পেয়ে তার ছোট ভাই হাসানুজ্জামান খোকা ছোট ভগনিপতি মাইদুর রহমান মিনা কে ধরে নিয়ে যায়। তারা রানী বাজার এলাকার দেওয়ান সিদ্দিক তার শ্যালক আফজাল হোসেন কে ও ধরে নিয়ে যায়। ২৬ মার্চ ভোরে আওয়ামীলীগ অফিসে যাবার সময় সেনাবাহিনী এমএলএ নাজমুল হক সরকার কে ধরে ফেলে। সেনাবাহিনী পুলিশ লাইনের বাঙালি পুলিশদের আত্মসর্মপন করতে বললে তারা পতিরোধ গড়ে তুললে তারা পালিয়ে যায়। রাতে পুলিশ লাইনের ম্যাগজিন রুমে ডুকতে না পেরে ক্যাপ্টেনটি ডিআইজি মামুন মাহমুদকে অভিযোগ করলে তার কথা শুনে ক্যাপ্টেনটি লজ্জায় সেখান থেকে চলে যায়। রাস্তায় রাস্তায় ব্যরিকেড দেয়া হতে থাকে। সরদহ ইপিআর বিওপির বাঙালিরা প্রস্তুত নিয়ে ফেলে। ২৭ মার্চ সেনাবাহিনী পুলিশ লাইনে গেলে প্রতিরোধে চুক্তি করতে বাধ্য হয় কিন্তু চুক্তি ভঙ্গ করে আলোচনার নামে ডিআইজি মামুন মাহমুদ কে ক্যান্টমেন্টে ডেকে নিয়ে হত্যা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী আওয়ামিলীগের অবাঙালি নেতা হাফেজ আব্দুস সাত্তারকে স্বাধীনতার পক্ষে থাকায় তাকে তার গনকপাড়ার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাবার সময় এক অফিসারের হস্তক্ষেপে তার দুই ছেলে মুন্না ও ইমতিয়াজ রক্ষা পেয়ে গেলো। এদিন পাকিস্থান সেনাবাহিনী কাঁঠালবাড়িয়া এলাকায় বাস থেকে নামিয়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্র লায়েক আলী কে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। রাজশাহী জেলা সদরের পরিস্থিতি নঁওগা ইপিআর ৭নং উইংয়ে জানানো হলে ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বাহিনী নিয়ে রাজশাহীতে আসার কথা জানান। পুলিশ লাইনের আশে পাশের ও অন্য স্থান থেকে পুলিশ লাইনে খাবার সরবরাহ করা হতে থাকে। সেনাবাহিনী ইপিআর, আনসার ক্যাম্প পুরিয়ে দেওয়ার মহুর্তে বাঙালি ইপিআর আনসাররা সেখান থেকে চলে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। ২৮ মার্চ সেনাবাহিনীকে বাধা দিতে পুলিশ লাইনের পাশে গির্জার সামনে ব্যরিকেড দেবার সময় কাটু নামে একজন শহিদ হন। সেনাবাহিনী তাদের দেয়া আত্মসর্মপনের সময় পার হবার সাথে সাথে পুলিশ লাইন আক্রমণ করলে রাজশাহীর প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি পুলিশেরা শহিদ হন। দক্ষিণ দিক ফাকা থাকায় অনেকে এদিক দিয়ে বেড়িয়ে আসেন। আশে পাশের কয়েকজন শহিদ হন। সাধারণ মানুষ এখান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে। বিকেলে কোট অঞ্চলেন পঞ্চিমে বসরি ইট ভাটার পাশে সেনাবাহিনীর কেসারাত উল্লাহ ও বিমান বাহিনীর কমান্ডো হারুন ওর রসিদের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে উঠলে পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সদস্য নিহত আহত হয়। ২৯ মার্চ ছাত্র নেতা মোহাম্মদ আলী কামাল সঙ্গী সহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী জেলা সদরে এসে হোটেল কাশিনায় পুলিশদের এক অফিসারের সাথে আলোচনা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ফিরে যান। এদিকে সরদাহ পুলিশ একাডেমীতে ইপিআরের সুবেদার নায়েক সিরাজউদ্দিন লস্কারের নেতৃত্বে বিদ্রোহ হলে ক্যাডেট কলেজের আ্যডজুটেন্ট ক্যাপ্টেন রশিদ, অধ্যাপক এবি সিদ্দিক সমর্থন দেন। পুলিশ একাডেমীকে কন্ট্রোলরুম করে প্রতিরোধ বাহিনী গঠন করা হয়। একাডেমীর ডিআইজি খালেক পালিয়ে যান। ৩০ মার্চ চারঘাট থানার নন্দনগাছিতে গ্রামবাসীর প্রতিরেধে পাবনা থেকে পালিয়ে আসা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি অংশ ধরাশাহী হয়। ছাত্রনেতা মোহাম্মদ আলী কামাল বিশেষ কাজে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী খড়চাক্কায় সীমান্তের দিকে যাওয়া রাজশাহীর জেলা প্রসাশক রশিদুল হাসান আত্মসর্মপন করান। জেলা প্রসাশকের সাথে এ সময় ছিলেন রহিম নাজির ও কয়েকজন। জেলা প্রশাসককে গ্রেফতার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাঠানো হয়। তাদের সাথে থাকা ইপিআর বাহিনী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিলে শক্তি বেড়ে যায়। (তথ্য সূত্র: বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল)
৩১ মার্চ সরদহ অঞ্চল থেকে ক্যপ্টেন রশিদ, অধ্যাপক এবি সিদ্দিক, সুবেদার সিরাজউদ্দিন লস্কর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অবস্থান নিলে ছাত্র নেতা সাধারণ জনগন সহযোগিতা করলেও ভিসি সাজ্জাদ হোসেন ষড়যন্ত্র করলে তারা বিশ্ববিদ্যাল ছেড়ে পূর্বেদিকে জেবের মিয়ার ইট ভাটায় অবস্থান করে অপেক্ষা করতে থাকেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এসপি শাহ আব্দুল মজিদকে আলোচনার নামে ডেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়ার অফিসার খলিলুর রহমান ঝুঁকি উপেক্ষা করে পুলিশ সাধারণ মানুষদের মধ্যে ঐক্য করে রাখতে ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য চৌকস রন বিদের অপেক্ষা শুরু হয়। সাধারণ মানুষ ছাত্র যুবক তরুনরা ক্যন্টনমেন্টেকে টার্গেট করে অবস্থান নিতে থাকে। (তথ্যসূত্র: বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহাতাব উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার মেজর সিরাজউদ্দিন লস্কর, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল, বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান খোকন বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ আব্দুল মান্নান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এ্যাড মতিউর রহমান । (সংক্ষিপ্ত)
লেখক: ওয়ালিউর রহমান বাবু, মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সংগ্রাহক ও সাংস্কৃতিক কর্মী।