মো: আইয়ুব আলী: জাতীয় জীবনে প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ সর্বজনস্বীকৃত। দেশের মানুষের শিক্ষার আয়োজন এবং জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার অনন্য ধাপ হলো প্রাথমিক শিক্ষা। আজকের উন্নত দেশগুলো সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে সকল নাগরিকের ন্যূনতম শিক্ষার চাহিদা পূরণ করে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতিক অগ্রগতির শীর্ষে আরোহণ করেছে। তাই আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হলে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজন অপরিহার্জ।
“সবার জন্য শিক্ষা”-একটি নীতিগত শ্লোগান। এর মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশকেই বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শিক্ষায় সমান সুযোগ দেয়ার বহিরূপ কিংবা নীতিগত রূপই হলো “সবার জন্য শিক্ষা”। এ নীতির বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর সার্বিক বিকাশ সাধন করে জাতীয় উন্নয়ন কার্যকে ত্বরান্বিত করা যায়।
জাতীয় উন্নয়ন কার্যকে দ্রুততর করতে শিক্ষার উন্নয়নের বিকল্প নেই। আর শিক্ষার জাতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পূর্ণাঙ্গতার রূপ দিতে হলে সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ অবারিত করা একান্ত অপরিহার্য। দেশের মোট জনগোষ্ঠির একটি অংশকে বাদ দিয়ে কাঙ্খিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই উন্নয়নে প্রতিবন্ধীদের যুক্তকরণে দূর করতে হবে সব বাধা।
জাতিসংঘ প্রতিবন্ধিতার যে সংজ্ঞা দিয়েছে তা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হলেন তাঁরা, যাঁদের দীর্ঘ মেয়াদী শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত ও ইন্দ্রিয়গত ক্ষতি হয়েছে; আর এ ক্ষতি নানা প্রকার প্রতিকূলতা সৃষ্টি করে এবং সমাজের অন্যদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে তাদের পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটায়। মোট কথা, কোনো ব্যাক্তি দীর্ঘস্থায়ী অসমর্থতার কারণে সমাজ ও পরিবেশে যে সমস্যার সম্মুখিন হয়, তাকে প্রতিবন্ধিতা বলে। প্রতিবন্ধিতা সম্পূর্ণ ভালো হয় না। তাই সমাজের অনেকে তাঁদের অবহেলার চোখে দেখেন।
প্রতিবন্ধিতা বিশ্বব্যাপী এক সমস্যা। বাংলাদেশেও এ সমস্যা কম প্রকট নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক জরিপ অনুযায়ী আমাদের জনসংখ্যার ১০ ভাগ তথা প্রায় ১ কোটি ৬০ লক্ষ ২০ হাজার মানুষ কোন না কোনভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার, যাঁরা দেশের উন্নয়নের মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন।
বাংলাদেশ, জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং ‘United Nations Charter of Childrens Rights’ সনদে স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ১৯৯৫ সালে সর্বপ্রথম প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে। ১৯৯৫ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী আইনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংসদ ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন (Disability Welfare Act) পাশ করে। ২০০৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর ১৮ তম আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির সুযোগ নিশ্চিতকরণে সকল বিদ্যালয়ের প্রতি আহব্বান জানান।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের প্রবেশগম্যতা খুবই কম। আর এই সীমাবদ্ধতার জন্য অসামঞ্জস্য শিক্ষা ব্যবস্থা, কঠোর ও অনমনীয় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষা পরিবেশ, পিতা মাতার অজ্ঞতা ও অসচেতনতা দায়ী। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৫% প্রতিবন্ধী শিশু সাধারণ শিক্ষায় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার স্বল্প মাত্রার প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে।
একীভূত শিক্ষা হলো এমন এক ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা, যাতে সকল শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়। অর্থাৎ সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন এনে বিভিন্ন সামর্থ্য বিশিষ্ট শিক্ষার্থীদের যথার্থ শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাকেই একীভূত বা ‘Inclusive Education’ বলে। এক্ষেত্রে প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই যথার্থ শিক্ষা গ্রহণের জন্য সমান সুযোগ থাকবে এবং এ সুযোগ সর্বোপরি সুনিশ্চিত করতে হবে। একীভূত শিক্ষার মূল কথা হলো “সব কিছু শিশুদের জন্য, শিশুদের জন্যই সব কিছু” ‘All for the children,for all the children’ একীভূত শিক্ষা ধারনা হতেই চালু হয়েছে একীভূত শিক্ষন-শিখন চেতনা। একীভূত শিক্ষন-শিখন বলতে বিভিন্ন সামর্থের শিক্ষার্থীদেরকে একই ধরনের শিক্ষন-শিখন চেতনায় অন্তর্ভূক্ত করে যথার্থ শিক্ষন-শিখন সম্পন্ন করার উপযুক্ত পরিবেশকেই বোঝানো হয়।
শিক্ষা সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার। শিক্ষার সমান সুযোগ সৃষ্টির অপূর্ব চেতনাই হলো একীভূত শিক্ষা। জাতীয় উন্নয়নের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ একান্তই আবশ্যক। প্রকৃতপক্ষে অধিক সংখ্যক প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে শিক্ষা ব্যবস্থার মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে এটা উৎসাহমূলক একটা বাস্তব পদক্ষেপ।
বাংলাদেশ সরকার শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনে নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধীদের চিহ্নিতকরণ, তাঁদের কাউন্সিলিং প্রদান, তাঁদের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, কর্ম-সংস্থানের ব্যবস্থা করাসহ নানামূখী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আর সরকার ও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে এ সকল কাজকে এগিয়ে নিয়ে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে পারবে।
অটিস্টিক, বুদ্ধি ও বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধীরা কেউ কেউ আজ নিজের অধ্যবসায়, চেষ্টা আর পরিশ্রমের ফলে পড়াশোনা করছেন, কেউ ভালো ছবি আঁকছেন, কেউ উপার্জন করে সংসার চালাচ্ছেন। কেউ আবার বিশেষ অলিম্পিকে অংশ নিয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনছেন। কিন্তু সমাজ আজও তাঁদের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে পারেনি। পারেনি তাঁদের প্রতি বৈষম্যের দৃষ্টি পরিবর্তন করতে। তাই স্কুলে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে তাদের নানা রকম হয়রানির শিকার হতে হয়। অথচ একটু সহযোগিতা করলে তারা আরও সহজভবে উৎরে যেতে পারেন সকল বাধা, দেশের উন্নয়নে রাখতে পারেন ভূমিকা।
একীভূত সমাজ বিনির্মাণে সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্তসহ সার্বজনীন পরিকল্পনার ভিত্তিতে সকল ভবন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব বা তাদের প্রবেশগমন উপযোগী করে তোলা সরকারের দায়িত্ব এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ ও প্রস্তাবিত জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আইন ২০১৫ অনুযায়ী সকল ভবন ও স্থাপনা নির্মাণে সকল মানুষের প্রবেশগম্যতা ও ব্যবহার উপযোগিতা নিশ্চিতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নেয়া না হলে এমন অবহেলাই প্রকাশ পাবে ভবিষ্যতেও।
জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকারী সনদের ২৪নং ধারাতে: শিক্ষার অধিকারের কথা উল্লেখ করে স্পষ্টত বলা হচ্ছে- প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরই শিক্ষা লাভের অধিকার আছে। আর এ সনদ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর। সেইসাথে আমাদের প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য বিশেষ শিক্ষার স্কুলের কথা না ভেবে সাধারণ স্কুলে লেখাপড়া করার পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে অভিভাবকসহ সমাজের সর্বস্তরে মানসিক বিকাশ ত্বরান্বিত করতে হবে।
লেখক মো: আইয়ুব আলী, প্রধান শিক্ষক, ঘোড়ামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বোয়ালিয়া, রাজশাহী।