শুক্রবার | ৪ঠা এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিজয় দিবসে বঙ্গবন্ধুর ডাক ‘আসুন সংগ্রাম করি দুর্নীতির বিরুদ্ধে’

বিজয় দিবসে বঙ্গবন্ধুর ডাক ‘আসুন সংগ্রাম করি দুর্নীতির বিরুদ্ধে’

মো. সফিকুল ইসলাম; প্রাচীন বঙ্গদেশের বুকে একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরে আজকের দিনে রক্তাক্ত অভ্যুদয় ঘটে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের। একজন নেতার একক নেতৃত্ব দিয়ে একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সেই জাতির জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার ঘটনা বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি ঘটেনি। যে রাষ্ট্রের ‘জনক’ বঙ্গের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিজয়ের এই সংগ্রামী দিনে বিজয়ী জাতির পক্ষ থেকে পিতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। একই সাথে বঙ্গমাতা বেগম মুজিব, জাতীয় চার নেতা, লাঞ্ছিত মা-বোন, সকল অমর শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিও অশেষ শ্রদ্ধা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন বাংলায় অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অবিরত সংগ্রাম করেছেন। জেল-জুলুম-অত্যাচার-জুলুম সহ্য করেছেন। জীবনের প্রায় দেড় দশক কাটিয়েছেন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। দুই হাজার বছরের বাঙালির লিখিত ইতিহাসে তাঁর মতো আর কোনো একজন বাঙালিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না যে যিনি বাংলার মানুষকে এতো ভালবাসতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু বাংলার গরীব, দুঃখী মানুষের জন্য সবসময় হাহাকার করতেন। তিনি বলতেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’ বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার ‘আমার বাবা শেখ মুজিব’ শীর্ষক এক লেখায় বলেছেন, ‘আমার বাবা আমাদের কাছে বড় বেশি সরল-সাধারণ মানুষ ছিলেন। তাঁর দু’ হাতের তালুতে মুখ রাখলে দেখতে পেতাম বাংলাদেশ ও তাঁর প্রিয় জনগণকে।’

বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে বিজয় দিবসে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বাণীতে সে কথাই বলেছেন জাতির পিতা শেখ মুজিব। অমর সেই বাণীর পুরো অংশ নিচে হুবহু উল্লেখ করছি। ‘উনিশ শ’ একাত্তর সালের ষোলই ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমাপ্তি। এই একই দিনে আমাদের দেশ গড়ার সংগ্রাম শুরু। স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়া বেশি কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরো বেশি আত্মত্যাগ, আরও বেশি ধৈর্য, আরও বেশি পরিশ্রম দরকার। স্বাধীনতা সংগ্রামে আরো বেশি সময় লাগার কথা, কিন্তু আমরা যদি একটু কষ্ট করি, একটু বেশি পরিশ্রম করি, সকলেই সৎ পথে থেকে সাম্যমত নিজের দায়িত্ব পালন করি এবং সবচাইতে বড় কথা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় বলতে পারি ইনশাল্লাহ্ কয়েক বছরেই আমাদের স্বপ্নের বাংলা আবার সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

ষোলই ডিসেম্বরের সঙ্গে আমাদের অনেক ব্যথা, বেদনা-আনন্দ গৌরব এবং আশা-আকাক্সক্ষা জড়িত। এই দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় এক লাখ পাকিস্তানী শত্রু আত্মসমর্পণ করেছে। কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে আরো শক্তিশালী শত্রু, এই শত্রু হলো অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা, বেকার ও দুর্নীতি। এই যুদ্ধের জয় সহজ নয়। অবিরাম এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে এবং একটি সুখী, সুন্দর অভাবমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। তবেই হবে আপনাদের সংগ্রাম সফল, আপনাদের শেখ মুজিবের স্বপ্ন ও সাধনার সমাপ্তি। আমি যে সুখী ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, সংগ্রাম করেছি এবং দুঃখ নির্যাতন বরণ করেছি সেই বাংলাদেশ এখনো আমার স্বপ্ন রয়ে গেছে। গরীব কৃষক ও শ্রমিকের মুখে যতদিন হাসি না ফুটবে, ততদিন আমার মনে শান্তি নাই। এই স্বাধীনতা তখনই আমার কাছে প্রকৃত স্বাধীনতা হয়ে উঠবে যেদিন বাংলাদেশের কৃষক-মজুর ও দুঃখী মানুষের সকল দুঃখের অবসান হবে। তাই আসুন, এই দিনে অভাব, দারিদ্র্য, রোগ, শোক ও জরার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম ঘোষণা করি। সংগ্রাম ঘোষণা করি চোরাচালানী, কালোবাজারী, অসৎ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ার কাজ সফল হবে না। আর সোনার বাংলা গড়তে না পারলে ত্রিশ লাখ বাঙালি যে স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে সেই স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে যাবে।’

জাতির পিতার এই বাণীর শেষ অংশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিজয়ের এই দিনে, চোরাচালানী, কালোবাজারী, অসৎ ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করার কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘এই সংগ্রামে জয়লাভ করতে না পারলে সোনার বাংলা গড়ার কাজ সফল হবে না।’ পিতার সরল উক্তি, ‘আর সোনার বাংলা গড়তে না পারলে ত্রিশ লাখ বাঙালি যে স্বাধীনতার জন্যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে সেই স্বাধীনতাও অর্থহীন হয়ে যাবে।’ প্রসঙ্গক্রমে বলি, জাতির পিতা তাঁর জীবনে জনসভায় শেষ ভাষণ রেখেছিলেন ঢাকার শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে, ১৯৭৫ সালে ২৬ মার্চ-এ । তখন তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ (বাকশাল)-এর চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যে দ্বিতীয় বিপ্লবের বিস্তৃত কর্মসূচি ওই জনসভায় ঘোষণা করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মহাসংগ্রামের ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, এক নম্বর হল, দুর্নীতিবাজ খতম করা। দুই নম্বর হল, কলে কারখানায়, ক্ষেতে খামারে প্রোডাকশন বাড়ান। তিন নম্বর হল, পপুলেশন প্ল্যানিং। চার নম্বর হল, জাতীয় ঐক্য।’

জীবনের শেষ ভাষণের অনেকাংশ জুড়ে ছিল দুর্নীতি বিষয়ে। কিছু অংশ হুবহু তুলে করছি, ‘আমি বলেছিলাম, ‘ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে শত্রুর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলবো বাংলার জনগণকে- এক নম্বর কাজ হবে, দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাবো। ক্ষমা করবো না। যাকে পাবো, ছাড়বো না। একটা কাজ আপনাদের করতে হবে। গণআন্দোলন করতে হবে। আমি গ্রামে গ্রামে নামবো। এমন আন্দোলন করতে হবে, যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চোরাচালান দেয় তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, কোথায় আছে, ওই চোর, ওই ব্লাকমার্কেটিয়ার, ঐ ঘুষখোর। ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের ওপর অত্যাচার করতে দেব না। কিন্তু আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে পারে কে? ছাত্র ভাইয়েরা পারে। পারে কে? যুবক ভাইয়েরা। পারে কে? বুদ্ধিজীবীরা পারে। পারে কে? জনগণ পারে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে দুর্নীতিবাজদের খতম করবার জন্য, বাংলাদেশের গরীব দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন করবার জন্য। এই দুর্নীতিবাজদের যদি খতম করতে পারেন, তাহলে শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগের দুঃখ চলে যাবে। …আমি এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, তা কারা করে? আমার কৃষক দুর্নীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক দুর্নীতিবাজ? না। তাহলে ঘুষ খায় কারা? ব্লাকমার্কেটিং করে কারা? বিদেশী এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোর্ড করে কারা? এই আমরা, যারা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত। এই আমাদের মধ্যেই রয়েছে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। দুর্নীতিবাজ এই শতকরা ৫ জনের মধ্যে, এর বাইরে নয়।

পবিশেষে বলি, বঙ্গবন্ধুর আজীবনের স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু তা প্রতিষ্ঠায় প্রধান অন্তরায় হিসেবে তিনিই চিহ্নিত করেছেন দুর্নীতি। এই দুর্নীতিকে দেশের এক নম্বর সমস্যাও তিনি ঘোষণা করেন; ঘোষণা করেন খতম করার।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় স্বাধীনতা বিরোধী কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন থামিয়ে দেয়া হয়। বিপদগামী কিছু সেনা সদস্যদের দিয়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট রাতে তাঁকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করানো হয়। বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠজন খোন্দকার মোশতাক কুখ্যাত মীর জাফরের ভূমিকায় শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেন নি, হত্যা করেছেন একটি জাতিকে জাতির স্বপ্নকে। তাঁর হত্যার সাথে সাথে বাঙালির জাতির কাঙ্খিত স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটে। তবে, হ্যাঁ আবার বাঙালির স্বপ্ন জেগে ওঠে যখন আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। সেই থেকে তিনি অবিরত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কতজন মানুষ বঙ্গবন্ধুর জীবনঘনিষ্ঠ আর সত্যব্রতী। বঙ্গবন্ধুর মহত্মম জীবনদর্শন থেকে আমরা অনেকেই আছি বহুদূরে। মুখে জপছি বঙ্গবন্ধু আর চিত্তেভরা দুর্নীতি।

লেখক : উপ-রেজিস্ট্রার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 


©2022 newsprobaha.com
Developed by- .:: SHUMANBD ::.