বিশ্ব বাজারে তাদের তৈরি সোনার চাহিদাও বেশ। কিন্তু এতসব ইতিবাচক দিকের পরও নানা বাধার কারণে নিজেদের স্বর্ণের অলংকার বিদেশে রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ।
২০২১ সালে সংশোধিত বাংলাদেশের স্বর্ণ নীতিমালার প্রস্তাবনায় কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, বিশ্বের অলংকার উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে বেলজিয়ামসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ, ভারত ও চীন অন্যতম। ২০১৯ সালে আর্থিক মূল্যে সারা বিশ্বে অলংকার মার্কেটের আকার ছিল ২২ হাজার ৯৩০ কোটি মার্কিন ডলার।
যা ২০২৫ সালে ২৯ হাজার ১৭০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। হস্তনির্মিত অলংকারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু নানাবিধ কারণে হস্তনির্মিত অলংকার রপ্তানিতে বাংলাদেশ তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি।
দেশের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতের স্বর্ণালংকার বানানোর শিল্পীরা যেসব অলংকার তৈরি করতে ১০ ভরি সোনা ব্যবহার করেন, আমাদের দেশের শিল্পীরা সাড়ে ছয় থেকে সাত ভরি সোনা ব্যবহার করে একই ধরনের অলংকার তৈরি করতে পারেন। এমনকি বাংলাদেশের অলংকারের মানও ভারতেহর চেয়ে ভালো।
আবার অলংকারের দামও এখানে কম। যেহেতু বিশ্ববাজারে স্বর্ণালংকারের চাহিদা রয়েছে তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে সুযোগ-সুবিধা পেলে অলংকার রপ্তানি করা সম্ভব।
এতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হবে যা আমাদের রিজার্ভে অবদান রাখবে। এছাড়া রপ্তানি শুরু করা গেলে এ খাতে বাড়বে কর্মসংস্থানও।
হস্তনির্মিত অলংকারের প্রায় ৮০ শতাংশ বাংলাদেশ ও ভারতে উৎপাদিত হয়। কিন্তু নানাবিধ কারণে হস্তনির্মিত অলংকার রপ্তানিতে বাংলাদেশ তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সহ-সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, আমাদের পাশের দেশ ভারত যদি স্বর্ণ রপ্তানি করতে পারে আমরা কেন পারব না? আমাদের শিল্পীরা তাদের সমমানের দক্ষ ও ভালো কাজ করতে পারে।
এজন্য আমাদের যেটা করতে হবে তা হলো এ খাতের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। স্বর্ণ ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্যবসা। এই ব্যবসায় সহজে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে চায় না।
এ ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে অন্য শিল্পের মতো সমান চোখে দেখতে হবে, সমান সুযোগ দিতে হবে।
অলংকার রপ্তানির শীর্ষে ভারত, কেন পারছে না বাংলাদেশ?
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বর্ণালংকার রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। বিশ্বের চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করছে দেশটি। ২০১৯ সালে ভারত ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সোনার অলংকার রপ্তানি করেছে।
এটা বিশ্বের সোনার অলংকারের চাহিদার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। সংস্থাটি জানায়, ভারতে প্রতিবছর সোনার চাহিদা ৬১১ টন। চাহিদার দিক দিয়ে বিশ্বে তাদের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
দেশটি তাদের এত বড় বাজারের চাহিদা পূরণ করেও ১২ বিলিয়নের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে
২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্বর্ণ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৭২ মার্কিন ডলার। ৮০’র দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবিধ উদ্যোগ গ্রহণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অলংকার রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের কারিগরদের হাতে তৈরি সোনার অলংকার পৃথিবী বিখ্যাত। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা রপ্তানিতে যেতে পারছি না?
জানতে চাইলে জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা জানান, এর কারণ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা। আমাদের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। কারণ আমাদের নিজস্ব সোনা নেই। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সোনা কিনতে হয়।
আমদানির অনুমতি সহজে মেলে না। ব্যাগেজ-রুলে আনতে গেলে দাম বেশি দিতে হয়। ভ্যাট-ট্যাক্সের পরিমাণ বেশি, শিল্পীদের মজুরি বেশি।
এছাড়া রপ্তানি পণ্য হিসেবে স্বর্ণ খাতের জন্য সরকারের কোনো বিশেষ প্রণোদনাও নেই। রয়েছে পলিসিগত সমস্যাও।
রপ্তানির জন্য সরকার কী উদ্যোগ নিতে পারে?
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর মতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে স্বর্ণ খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৭২ মার্কিন ডলার। ৮০’র দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিবিধ উদ্যোগ গ্রহণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের অলংকার রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের প্রথম কাজ এ খাতে নীতিগত সুবিধা দেওয়া। প্রণোদনার ঘোষণা দেওয়া। এটা হতে পারে নগদ অর্থ কিংবা পলিসিগত সুবিধা। যেমন, কেউ ১০ কেজি স্বর্ণ রপ্তানি করলে ৫০ শতাংশ স্বর্ণ আমদানির ট্যাক্স মওকুফ করে দিতে পারে।
এছাড়া এ খাতের রপ্তানিকারকদের ১০ বছরের জন্য ট্যাক্স থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং ভ্যাট কমানো জরুরি। এসব প্রণোদনা যদি দিতে পারে তাহলে উদ্যোক্তারা এ খাতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহ পাবেন।
রপ্তানি করতে গেলে দামের ক্ষেত্রে সমন্বয় আনতে হবে।
কারণ আমাদের দেশে হঠাৎ হঠাৎ স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়। যখন রপ্তানি করবেন তখন যদি প্রতিযোগী দেশের সাথে সমন্বয় না থাকে তাহলে রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়তে হবে।
ঢাকার জেনারেল জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী এবং বাজুসের সহ-সভাপতি ও স্ট্যান্ডিং কমিটি অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্যাক্সেশনের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশে সোনার কোনো খনি নেই। সোনা বা স্বর্ণালংকার রপ্তানি করতে হলে স্বর্ণ আমাদনিই একমাত্র পথ। কিন্তু স্বর্ণ সহজে আমাদনি করা যায় না।
স্বর্ণ দেশে যা আসে তার বেশির ভাগই ব্যাগেজ-রুলের মাধ্যমে আসে। কিন্তু আমাদের ট্যাক্স-ভ্যাট এর পরিমাণ অনেক বেশি।বেশি মূল্য দিয়ে সোনা এনে কম দামে রপ্তানি করা সম্ভব নয়। তাই স্বর্ণালংকার রপ্তানি করতে হলে নীতি পরিবর্তন করতে হবে। ব্যবসায়ীরা যেন আন্তর্জাতিক বাজর ধরে সোনা আনতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
স্বর্ণালংকার তৈরিতে যে যন্ত্রাংশ প্রয়োজন তা আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ফ্রি রাখতে হবে এবং নগদ সহায়তা দিতে হবে। কারিগরদের মজুরির ওপর প্রণোদনা দিতে হবে। এসব সহায়তার জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
হাতের তৈরি স্বর্ণালঙ্কার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে ভারত। তাদের স্বর্ণালঙ্কার বেশিরভাগ তৈরি করে বাঙালি কারিগররা। আমাদের দেশের কারিগরদের কাজ তাদের চেয়ে নিখুঁত। তাই সুযোগ পেলেই রপ্তানি বাজার দখল ধরতে পারব- বলেন এ স্বর্ণ ব্যবসায়ী।
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস :
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, রপ্তানি করতে গেলে দামের ক্ষেত্রে সমন্বয় আনতে হবে। কারণ আমাদের দেশে হঠাৎ হঠাৎ স্বর্ণের দাম বেড়ে যায়।
যখন রপ্তানি করবেন তখন যদি প্রতিযোগী দেশের সাথে সমন্বয় না থাকে তাহলে রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়তে হবে। নতুন পণ্য রপ্তানি করতে হলে অবশ্যই প্রণোদনা দরকার। কারণ বিশ্বের সব দেশই এসব ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেয়।
আমাদেরও রপ্তানিতে যেতে হলে আমাদের সরকারের একটা সাপোর্ট দরকার আছে। এটা নীতিগত ও নগদ সহায়তা হতে পারে। অর্থাৎ যারা রপ্তানির জন্য গহনা উৎপাদন করবে তাদের ট্যাক্স কমিয়ে দিয়ে নগদ প্রণোদনা দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তারা উৎসাহিত হবে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে থাকা আমাদের দূতাবাস কর্মকর্তারা শুধু শ্রমিক পাঠানোর কাজে ব্যস্ত। ব্যবসায়িক দিকগুলো তেমন গুরুত্ব দেন না তারা। মধ্যপ্রাচ্যে সোনার অলংকারের বিশাল বাজার রয়েছে যা নিয়ে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। তারা ব্যবসা নিয়ে একটু কাজ করলেই আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব। সোনা একটি মূল্যবান পণ্য, অল্প বিক্রি করলেই বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাবে।
এখন সময় এসেছে এ খাতের ব্যবসার ধরন পাল্টানোর। স্থানীয় বাজারকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে কীভাবে স্বর্ণ রিপেয়ারিং করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় এই বিষয়টিতে বেশি জোর দিতে হবে। সেই অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ বা প্রস্তুতি নিতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
তিনি আরও বলেন, স্বর্ণের ক্রেতারা একটু সৌখিন। তাদের ডিজাইনের বিষয়ে বেশি আগ্রহ। এ ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে আছি। কারণ আমাদের শিল্পীরা ভালো মানের সুন্দর ডিজাইন করতে পারেন।
এজন্য আমরা রপ্তানিতে গেলে অন্যদের তুলনায় দাম বেশি পাব। এছাড়া মেশিন দিয়ে যে অলংকার তৈরি করে এটাও নিখুঁত হয়। তাই রপ্তানির জন্য হাতের তৈরি ও মেশিনের কাজ দুটির ওপরই জোর দিতে হবে। দুটোর সমন্বয়ে এগুতে পারলে বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানো সহজ হবে।
রপ্তানির ব্যাপারে বাজুসের ভূমিকা কী?
জানতে চাইলে সংগঠনের সহ-সভাপতি ও সিরাজ জুয়েলার্সের মালিক ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন বলেন, আমাদের সব সদস্যকে নিজ নিজ জুয়েলারি দোকানে মানসম্পন্ন অলংকার তৈরি করতে হবে। এখন বেশিরভাগ পণ্যই হলোগ্রাম যুক্ত। এছাড়া আমাদের পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছেও।
আমরা কোয়ালিটিতে কোনো ছাড় দেব না। পাশাপাশি বাজুসের যেসব ব্যবসায়ী আছেন তারা যে পরিমাণ জিনিস বিক্রি করবে ক্যাশ মেমোতে তা উল্লেখ করতে হবে এবং অলংকারের গায়ে হলমার্ক থাকতে হবে– এ বিষয়ে আমরা ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বাড়াচ্ছি। এক্সপোর্ট কোয়ালিটি অলংকার তৈরির জন্য শিল্পীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
দেশের স্বর্ণশিল্পের চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি বাড়াতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ অপরিশোধিত সোনা পরিশোধনের জন্য ‘বসুন্ধরা গোল্ড রিফাইনারি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে।
এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম সোনা পরিশোধনাগার তেরি করল। আগামীতে বিশ্ববাজারে রপ্তানি হবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা সোনার বার, যা আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণেও বড় ভূমিকা পালন করবে।
বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, এখন সময় এসেছে এ খাতের ব্যবসার ধরন পাল্টানোর। স্থানীয় বাজারকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে কীভাবে স্বর্ণ রিপেয়ারিং করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় এই বিষয়টিতে বেশি জোর দিতে হবে।
সেই অনুযায়ী কার্যক্রম গ্রহণ বা প্রস্তুতি নিতে হবে। বাজুসের প্রেসিডেন্ট এমন একটি উদ্যোগ নিয়েছেন। দেশে সোনা পরিশোধনাগার তৈরি করছেন তারা। এ ধরনের উদ্যোগ অন্যদেরও নিতে হবে।
এজন্য বাজুসের উচিত হবে যারা জুয়েলারির সঙ্গে জড়িত তাদের প্রস্তুত করা। দেশের উৎপাদিত স্বর্ণালংকার যখন রপ্তানি হবে তখন এ খাত সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।