রবিবার | ৬ই এপ্রিল, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২৩শে চৈত্র, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যেভাবে আত্মগোপনে ছিলেন সিরিজ বোমা হামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি

যেভাবে আত্মগোপনে ছিলেন সিরিজ বোমা হামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি

প্রবাহ ডেস্ক: ২০০৫ সালের সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে পলাতক থাকা জেএমবি সদস্যকে গতকাল রাতে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব-৩।

শুক্রবার (২৩ জুন) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য জানায় র‍্যাব।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামি তুহিন রেজা তেজগাঁও থানাধীন তেজগাঁও রেলগেইট এলাকায় বসবাস করত। গ্রেফতারের পর তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এসময় সে জানায়, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে বোমা হামলা চালায় জেএমবি। এর মধ্যে ঝিনাইদহ শহরে ডিসি অফিস, জেলা জজ আদালত চত্বর, বাস টার্মিনাল ও কলেজ মোড়সহ বেশ কয়েকটি স্থানে একযোগে বোমা হামলা ও নিষিদ্ধ লিফলেট ছড়ানোর কার্যক্রম চালায় জেএমবি। একযোগে হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতির ঘোষণা করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

গ্রেফতারকৃত তুহিন রেজা ২০০৪ সালে জেএমবি’র ঝিনাইদহ সদর শাখায় সদস্য হিসেবে যোগদান করে। যোগদানের পর থেকে সে অত্র শাখার লিফলেট তৈরি, লিখিত প্রচার-প্রচারণার সম্পাদনা, গোপন ও নাশকতামূলক খবরাখবর আদান-প্রদান, বিভিন্ন ভিডিও এডিটিং এর মাধ্যমে তৈরিকৃত বিভ্রান্তিমূলক প্রামাণ্যচিত্র দ্বারা তরুণদের পথভ্রষ্ট করত। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ববর্তী দীর্ঘ সময় ধরে তারা হামলার নীলনকশা সাজায়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭ আগস্ট ভোর হতেই অন্যান্য হামলাকারীদের সাথে রেজা আদালত চত্বরের আশেপাশে অবস্থান নেয় এবং হামলার সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এলোপাথাড়ি বোমা হামলার পর তারা বিভিন্ন দিকে দৌড়ে পালিয়ে যায়।

র‍্যাবের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেফতারকৃত আসামি ১৭ আগস্ট বোমা হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে এসে ঝিনাইদহ সদরে জঙ্গি ক্যাম্পে কিছুদিন গাঢাকা দিয়ে থাকে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলে এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হলে কিছুদিনের মধ্যে ধৃত আসামি পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। এখানে সে প্রথমে যাত্রাবাড়ী পরবর্তীতে খিলগাঁও, উত্তরা, মহাখালীসহ বিভিন্ন জায়গায় স্থান পরিবর্তন করে বসবাস করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার ভয়ে সে বিভিন্ন সময় বাসা পরিবর্তন করে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বসবাস শুরু করে। ২০২১ সাল থেকে সে তেজগাঁও এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করতে থাকে এবং সেখান থেকেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পলাতক অবস্থায় সে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভিডিও এডিটিংসহ বিভিন্ন সফটওয়্যার ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত।

উল্লেখ্য, নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) কর্তৃক ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। ওই সময় সারা দেশের ৬৩টি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকার ৩৪টি স্পটসহ সর্বমোট ৪৫০টি স্পটে প্রায় ৫০০ বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় জেএমবি এর জঙ্গিরা। আধা ঘণ্টার ব্যবধানে চালানো এ সিরিজ বোমা হামলায় ২ জন নিহত এবং দুই শতাধিক মানুষ আহত হয়। একযোগে এই হামলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতির জানান দেয়ার চেষ্টা করেছিল জেএমবির সদস্যরা।

ওই সিরিজ বোমা হামলায় সারাদেশের মতই ঝিনাইদহ জেলার ডিসি অফিস, জজ কোর্ট ও পায়রা বন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় একই সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি কর্তৃক একযোগে সিরিজ বোমা হামলা ঘটানো হয়। সারাদেশ ব্যাপী আলোড়ন ও ত্রাস সৃষ্টির ঘটনায় তাৎক্ষনিকভাবে উক্ত সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনসহ অপরাধীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুততার সহিত তদন্ত শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় ঝিনাইদহ সদর থানায় অজ্ঞাতনামা জড়িতদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয় যার মামলা নং-১৭, তারিখ-১৭/০৮/২০০৫। মামলাটির তদন্তে ঘটনাটি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) কর্তৃক একযোগে ঘটানোর সত্যতা প্রমাণিত হয়। ঝিনাইদহ জেলায় সংগঠিত উক্ত বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় মোট ২১ জন জড়িত মর্মে বিজ্ঞ আদালতে২০০৫ সালের ২০ নভেম্বর একটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

মামলাটি স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ঝিনাইদহ কর্তৃক বিচার শেষে অভিযুক্ত ২১ জনের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হলে আসামিদের সকলকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু আসামিরা মৃত্যুদন্ডাদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে বিজ্ঞ আদালত তাদের অভিযোগপত্র পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে ২০০৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করেন এবং ৭ জন আসামিকে খালাস প্রদান করেন। পরবর্তীতে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপরতা চালানো শুরু করে।

এরই প্রেক্ষিতে এযাবৎ সাজাপ্রাপ্ত ১৪ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার করে আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়। পলাতক ২ জনের মধ্যে ওই মামলার ১০ নং অভিযুক্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত দীর্ঘ ১৮ বছর যাবত পলাতক জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) এর সদস্য তুহিন রেজা। গতকাল রাতে রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন তেজগাঁও রেলগেইট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-৩ এর একটি আভিযানিক দল। ওই মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ৭ নং অভিযুক্ত মোহন এখনো পলাতক রয়েছে। তবে তাকে গ্রেফতারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।


©2022 newsprobaha.com
Developed by- .:: SHUMANBD ::.